Labels

আমাদের অ-আ-ক-খ : একটু নতুন ভাবে দেখা (১ম পর্ব)

 আমাদের অ-আ-ক-খ : একটু নতুন ভাবে দেখা (১ম পর্ব)



  সব শিশুরই হাতেখড়ি হয়ে থাকে অ-আ-ক-খ দিয়ে। অর্থাৎ বুনিয়াদি শিক্ষায় আমরা যে স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে পরিচিত হই, সেটার ওপর ভর করেই শিক্ষা-জীবনের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাই। তবে সেই স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, অবস্থান, উচ্চারণ স্থান অথবা অন্যান্য তাৎপর্যপূর্ণ কথাগুলো কিন্তু আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে এড়িয়ে যাই, বা ততটা গুরুত্ব দেই না ।  অন্তত আমি আমার প্রাথমিক স্কুল-শিক্ষায় সেই কথাগুলোর সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না, বা সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমার মনে কোনো প্রশ্ন জাগেনি। ছেলেবেলায় আমরা সকলেই শুধু অ-আ-ক-খ চোখ বুজে মুখস্ত করেছি, এবং সকাল-সন্ধ্যায় চিৎকার করে করে সেগুলো আওড়ে গগন ফাটিয়েছি। 

    সে যাই হোক, এবার প্রশ্ন হল, এই যে আমরা স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ পড়ে এসেছি এতদিন, সেগুলো কেন সেভাবে সাজানো হয়েছে সে বিষয় নিয়ে কি আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে মাথা ঘামিয়েছি? 

    যেমন ধরা যাক স্বরবর্ণ ‘অ আ ই ঈ উ ঊ ঋ এ ঐ ও ঔ’। এই বর্ণগুলোকে পরপর এভাবেই কেন সাজানো হয়েছে, সেগুলো এভাবেও তো রাখা যেতে পারত ‘ঔ ঋ ঊ আ অ এ ঈ ই ও উ ঐ’। কিংবা ‘ক খ গ ঘ ঙ’, এরা এভাবেই কেন নিজেদের স্থান দখল করে রয়েছে? ‘খ ঙ ক ঘ ক’ এভাবেও তো সাজানো যেতে পারত। অথবা ‘শ ষ স’ এই শিষধ্বনিগুলোকে ‘স শ ষ’ এভাবেও তো রাখা যেতে পারত। বা সমস্ত ব্যঞ্জনবর্ণগুলোকেই ওলটপালট করে ‘ম ট ঘ ক দ ফ হ ণ চ…’ এভাবেও রাখা যেতে পারত। কিন্তু রাখা হয়নি। কেন? 

    আসলে সংস্কৃত ভাষায় যাঁরা দখল রাখেন তারা নিশ্চয় মাহেশ্বর সূত্র সম্পর্কে পরিচিত। সেখানেই বর্ণগুলো শ্রেণিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত হয়েছিল। সেই বর্ণবিন্যাস এতটাই যুক্তিপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত যে বিশ্বের আর কোনো ভাষায় এমনটা খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই মাহেশ্বর সূত্র অবলম্বন করেই আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ী রচনা করেছিলেন। নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলো, যেমন বাংলা-অসমিয়া-ওড়িয়া-হিন্দি-মারাঠি-গুজরাটি-পাঞ্জাবি ইত্যাদি, এই সমস্ত ভাষাগুলোতেই বর্ণ-বিন্যাস আমাদের সেই প্রাচীন সমৃদ্ধ রীতি অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে। কারণ এই ভাষাগুলো প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০) স্তর অতিক্রম করে মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দ) হয়ে অবশেষে আধুনিক রূপ গ্রহণ করেছে। 

    এবার আসছি মূল কথায়। কেন বর্ণগুলো তাদের নির্দিষ্ট স্থান দখল করে রয়েছে? ‘অ’ দিয়েই শুরু করা যাক। মাহেশ্বর সূত্রের প্রথমেই ‘অচ’ অর্থাৎ স্বরবর্ণগুলো নির্দেশ করা হয়েছে এভাবে ‘অ ই উ…’। ‘অ’ বর্ণকে প্রথমে রাখার কারণ কী, সে সম্পর্কে পণ্ডিতরা সূক্ষ্মভাবে বিচার করেছেন। ‘অ’ বর্ণটির উচ্চারণ স্থান কণ্ঠ, তাই সেটা শুরুতেই থাকে; কারণ ফুসফুস থেকে যখন বায়ু মুখগহ্বর দিয়ে বাইরের দিকে প্রস্থান করে তখন আমাদের বাগযন্ত্রে কণ্ঠেই প্রথম চাপ সৃষ্টি করে বা স্পর্শ করে। তাই কন্ঠ্যধ্বনি সবার আগে রাখা হয়। ব্যঞ্জনবর্ণের ক্ষেত্রেও ‘ক খ গ ঘ ঙ’ দিয়ে শুরু হয়েছে যা কণ্ঠ্যধ্বনি। এরপর যেসব বর্ণ ক্রমে তালু, মূর্ধা দন্ত, ওষ্ঠ ইত্যাদি স্থানে উচ্চারিত হয় সেগুলো পর পর রাখা হয়। ‘অ’-এর পরই ‘আ’ রাখা হয়েছে কারণ সেটা ‘অ’-এর দীর্ঘ রূপ, যার উচ্চারণ স্থান কণ্ঠ। এরপর ‘ই’ এবং এটার উচ্চারণ স্থান তালু। এরই দীর্ঘ রূপ হচ্ছে ‘ঈ’। এবার আমরা পাচ্ছি ‘উ’ এবং এর দীর্ঘ রূপ ‘ঊ’। এই বর্ণদুটির উচ্চারণ স্থান ওষ্ঠ, অর্থাৎ যখন আমরা ‘উকিল’ বলতে গিয়ে ‘উ’ উচ্চারণ করি তখন আমাদের ঠোঁটদুটো চোখা করে সেখানে চাপ সৃষ্টি করে। ঠোঁটটাকে পেছনের দিকে টেনে কিন্তু আমরা কখনো ‘উ’ উচ্চারণ করতে পারব না। আসলে ঠোঁটই ‘উ’ উচ্চারণ নিয়ন্ত্রণ করে, তাই ওষ্ঠ্যধ্বনি। এরপর আমরা পাই ‘ঋ’, উচ্চারণ-স্থান মূর্ধা; এবং ‘ঌ’, উচ্চারণ-স্থান দন্ত (যদিও আজকের যুগে বাংলা ও অসমিয়া বর্ণমালায় ঌ-র এর অস্তিত্ব নেই)। এবার প্রশ্ন হতে পারে যে, কণ্ঠ-তালু-মূর্ধা-দন্ত-ওষ্ঠ এই নিয়ম অনুযায়ী ওষ্ঠ্যধ্বনি ‘উ’-এর আগে মূর্ধন্যধ্বনি ‘ঋ’ থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তা হল না কেন? এক্ষেত্রে ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলেছেন যে ‘ঋ’ এবং ‘ঌ’ এই দুটো বর্ণ আসলে অনেকটাই ব্যঞ্জনধ্বনির মতো, অর্থাৎ অর্ধব্যঞ্জন। তাই সেটাকে পূর্ণস্বর অর্থাৎ ‘অ আ ই ঈ উ ঈ’ এবং দ্বিস্বর ধ্বনি ‘এ ও ঐ ঔ’ এর মাঝখানে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে পূর্ণস্বর ও অন্যদিকে দ্বিস্বর, এবং তারই মাঝখানে এই অর্ধব্যঞ্জন ধ্বনি ‘ঋ’। এবার প্রশ্ন হতে পারে যে দ্বিস্বর ধ্বনি কী? আসলে যে বর্ণে দুটো স্বর যুক্ত থাকে সেটাই দ্বিস্বর বা যুগ্মস্বর, যেমন ঐ= অ+ই, ঔ= অ+উ (বাংলা বা অসমিয়া উচ্চারণে অবশ্য এগুলো ঐ= ও+ই, ঔ=ও+উ)। এখানে আবার প্রশ্ন হতে পারে যে ‘এ’ আর ‘ও’ দ্বিস্বর হল কী করে? আসলে আমরা যেভাবে বাংলা অথবা অসমিয়াতে ‘এ’ বা ‘ও’ উচ্চারণ করি, প্রাচীন যুগে ঋষিরা সেভাবে করতেন না। তাঁদের ‘এ’ অথবা ‘ও’ উচ্চারণে দুটো ধ্বনি থাকত। ভাষাবিদ সত্যরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে ‘এ’ স্বরটি হ্রস্ব যুগ্মধ্বনি অই (ai) এবং ‘ও’ স্বরটি হ্রস্ব যুগ্মধ্বনি অউ (au) থেকে উৎপন্ন। সংস্কৃত সন্ধি থেকেও আমরা ব্যাপারটা অনুমান করতে পারি, যেমন ‘দেব + ইন্দ্রঃ = দেবেন্দ্র’, অর্থাৎ অ + ই = এ। ঠিক তেমনি ‘নীল + উৎপলম্‌ = নীলোৎপলম্‌’, অর্থাৎ অ + উ = ও ।  

    ‘ঋ’ সম্পর্কে আরও দুচারটে কথা বলা যেতে পারে। যেমন, ‘ঋ’ বর্ণটাকে আমরা বর্ণমালায় স্থান দিই বটে কিন্তু প্রকৃতার্থে ‘ঋ’র উচ্চারণটাই আমরা (বাংলা কিংবা অসমিয়াতে) করতে পারি না। আমরা ‘ঋ’-কে বলি ‘রি’। যেমন ‘ঋষি’ হয়ে যায় ‘রিশি’, ‘ঋণ’ হয়ে যায় ‘রিন’, ‘গৃহ’ হয়ে যায় ‘গ্রিহ’, ‘বৃক্ষ’ হয়ে যায় ‘ব্রিক্‌খো’ ইত্যাদি। আচ্ছা, উচ্চারণই যদি করতে না পারি তবে বর্ণমালায় রাখলাম কেন? কারণ সংস্কৃত থেকে যেসব শব্দ সরাসরি আমাদের শব্দভাণ্ডারে এসেছে, অর্থাৎ যেসব শব্দ তৎসম, সেগুলো আমরা পাল্টাতে পারি না, যেমন ‘ঋষি’ ‘মৃগ’, ‘ঋষভ’, ‘বৃক্ষ’, ‘গৃহ’ ইত্যাদি। তবে প্রাকৃতে সেই শব্দগুলোর পরিবর্তিত রূপ আমরা দেখতে পাই, কারণ প্রাকৃতে ‘ঋ’-র ব্যবহার নেই, যেমন— ‘মৃগ > মিগ’, ‘ঋষি > ইসি’, ‘ঋষভ > উসহ’ ইত্যাদি। অতএব সহজভাবে বলতে গেলে, ঋ-যুক্ত শব্দ যদি কালচক্রে পাল্টে গিয়ে থাকে তবে সেক্ষেত্রে বানানে ‘ঋ’র অস্তিত্ব আর থাকে না। এছাড়াও যে কোনো বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রেও আমরা ‘ঋ’র ব্যবহার দেখি না। অতএব শেষে এটাই বলা যায় যে ‘ঋ’র উচ্চারণ বাংলা বা অসমিয়া ভাষায় না থাকলেও তৎসম শব্দের খাতিরে আমরা ‘ঋ’কে বর্ণমালায় স্থান দিচ্ছি। তবে কখনো এটা ভেবেও আমরা আশ্চর্য হই যে বৈদিক যুগে ‘দীর্ঘ ঋ’-ও ছিল, এবং সেটাকে লেখা হত এভাবে ‘ৠ’, যেমন ‘পিতৃ (প্‌+ই+ত্‌+ঋ)+ ঋণ (ঋ+ণ্‌) = পিতৄণ (প্‌+ই+ত্‌+ঋ+ঋ+ণ্‌)। শুধু তাই নয় বৈদিক যুগে বর্ণমালায় ‘ঌ’-র পাশাপাশি ‘দীর্ঘ ঌ’-ও ছিল, এবং সেটাকে লেখা হত এভাবে ‘ৡ’। 

    এই আলোচনায় মূলত স্বরবর্ণ সম্পর্কে কথাগুলো বলা হল। ব্যঞ্জনবর্ণের ক্ষেত্রেও উচ্চারণস্থানের ওপর ভিত্তি করে খুব চমৎকারভাবে সেগুলো বর্ণমালায় সাজানো হয়েছে। সুযোগ পেলে পরবর্তী আলোচনায় সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব। আমার বিশ্বাস, আমরা যদি আমাদের শিশুদের খুব সহজ ভাবে বিষয়টা সম্পর্কে আভাস দেই তাহলে তাঁদের মধ্যেও বর্ণমালার অবস্থান-বিন্যাস সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হবে এবং তারা খুব গর্বের সঙ্গে বলতে পারবে যে তাদের মাতৃভাষা ধ্বনিতাত্ত্বিক দিক থেকে অন্যান্য বিদেশি ভাষা থেকে অনেক সমৃদ্ধ।




ড০ বরুণ কুমার সাহা

সহকারী অধ্যাপক

বাংলা বিভাগ, গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়

Post a Comment

0 Comments