স্বামী বিবেকানন্দের মাতৃভক্তি ও স্বদেশপ্রীতি
রাবণকে বধ করে রাম লঙ্কা জয় করেন এবং সীতাদেবীকে উদ্ধার করেন । লঙ্কার চোখধাঁধানো ঐশ্বর্য ও মনোমোহন সৌন্দৰ্য দেখে লক্ষ্মণ দাদাকে বললেল — এমন অপূর্বসুন্দর স্বর্ণময়ী লঙ্কা যখন আমরা জয় করেছি তখন এখানেই রাজত্ব করি না কেন! প্রাণপ্রিয় ভাই-এর কথা শুনে রাম বললেন— তা হয়না ভাই এবং সগর্বে ঘোষণা করলেন সেই চিরন্তন বাণী —
অপি স্বর্ণময়ী লঙ্কা ন মে রোচতে লক্ষ্মণ।
জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।।
— রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড
অর্থাৎ, লক্ষ্মণ, এই স্বর্ণময়ী লঙ্কা নিঃসন্দেহে অতীব সুন্দর কিন্ত তথাপি তাহাতে আমার রুচি নেই। কারণ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও মহতী। এ শুধু রামচন্দ্রের মুখনিঃসৃত বাণীই নয়, এতে অনেক গভীর তত্ত্ব লুকিয়ে আছে।
স্বামী বিবেকানন্দের সংক্ষিপ্ত জীবন ও কার্যাবলীর ওপর একবার চোখ বোলালেই দেখা যায় "জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী" কথাটার এক জীবন্ত বিগ্রহ ছিলেন তিনি। নিজের জন্মদাত্ৰী মা, গুরুমা ও বৃহৎ অর্থে সমস্ত মাতৃজাতি এবং দেশমাতাই ছিল তাঁর কাছে প্রাণাধিক প্রিয় ও আরাধ্যা।
নরেন্দ্রনাথ যেদিন গ্র্যাজুয়েট হলেন, সেদিনই পিতৃহারাও হলেন। ঘরে প্রচণ্ড অভাব অনটন। পরিবারে তখন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নরেন্দ্রনাথ। অর্থাৎ পরিবারে যখন তাঁকে সবচাইতে বেশি প্রয়োজন তখন তিনি আধ্যাত্মিক টানে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন। তিনি গৃহত্যাগ করলেন কিন্তু মাকে অকূলসাগরে ভাসিয়ে দিলেন না — আমৃত্যু মায়ের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, মোটা ভাত - কাপড়ের চিন্তা করে গেছেন। সন্ন্যাসীরা পূর্ব আশ্রমের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখেন না, সেটাই নিয়ম। পিতৃ-প্রদত্ত নামটা পর্যন্ত ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু বিশ্ববিশ্রুত সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ এক্ষেত্রে ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি যে শুধু বিধবা মা ও ছোট ছোট ভাইদুটির ভরণপোষনের ব্যবস্থা করেছেন তাই নয়, মা-কে তীর্থদর্শন করিয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মের পরম্পরা রক্ষা করে পরিবারের জ্যেষ্ঠপুত্রের কর্তব্যও পালন করেছিলেন। মাকে নিয়ে স্বামীজি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের লাঙ্গলব্ন্ধ, ঢাকেশ্বরী, চন্দ্রনাথ এবং অসমের কামাখ্যা দর্শন করিয়েছিলেন। দাক্ষিণাত্যে যাওয়ারও পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু স্বামীজির শারীরিক অসুস্থতার কারণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
বেলুড়ে অবস্থানকালে স্বামীজি যেমন প্রায়ই মায়ের কাছে যেতেন তেমনি মায়েরও যখনই ইচ্ছা হতো তাঁর আদরের 'বিলু'কে দেখতে তখনই ছুটে যেতেন বেলুড়ে। মায়ের প্রদত্ত শিক্ষা তাঁর জীবনের পথ তৈরি করেছিল, সেকথা তিনি খোলাখুলি ভাবে বলেওছেন অনেক জায়গায়। মায়ের প্রতি তাঁর ভক্তি-শ্রদ্ধা এত গভীর ছিল যে, তিনি বলতেন — "যারা মাকে সত্যি সত্যি পূজা করতে পারে না, তারা কখনও বড়ো হতে পারে না।" পৃথিবীর কোনও মাতৃভক্ত এই কঠিন কথাটাকে এত সহজভাবে এত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পেরেছেন?
স্বামীজির মাতৃভক্তি পাশ্চাত্যবাসীদেরকেও কীভাবে প্রভাবিত করত তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৮৯৪ সালের অক্টোবর মাস। স্বামীজি ' ভারতীয় নারীর আদর্শ' বিষয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন, যেখানে 'মাতৃত্বের আদর্শ' বিষয়টিও বিশেষভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছিল। শ্রোতারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। পরবর্তী বড়দিনে কেমব্রিজ ও ম্যাসাচুসেটস - এর কয়েকজন মহিলা ভুবনেশ্বরী দেবীকে একটি সুভাষিত অভিনন্দনপত্র ও মাতা মেরির কোলে শিশু যীশুর একটি অপূর্ব ছবি পাঠিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তাঁরা লিখেছিলেন, "মেরিপুত্রের দানকে সারা বিশ্ব যখন উদযাপন করছে এবং অপার আনন্দিত এরকম খ্রিস্টমাস- জোয়ারের আবহটাই মনে হয় তোমাকে অভিনন্দিত করার উপযুক্ত সময়। আমরা, যারা তোমার পুত্রের সান্নিধ্যে এসেছি, তারাই তোমাকে এই অভিনন্দন পাঠাচ্ছি। 'ভারতে মাতৃত্বের আদর্শ' বিষয়ে একদিন তিনি ভাষণ দিতে গিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের প্রতি উদারভাবে সেবার কথা বলেছিলেন এবং তিনি তাঁর এই গুণের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তোমার পায়ে অর্পণ করেছিলেন। যারাই এই ভাষণ শুনেছে তারাই তাঁর মাতৃভক্তির দ্বারা অনুপ্রাণিত ও উত্থিত হয়েছে।" ১.
সংসারের অভাব অনটন অনশন অর্ধাশনে মা যখন বিব্রত তখনই নরেন গৃহত্যাগ করেছিলেন। মা কিন্তু তেমনভাবে বাধা দেননি। জীবনের অন্তিম লগ্নে কজন সন্ন্যাসী ভুবনেশ্বরী দেবীকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলেন। আশীর্বাদ দিয়ে তিনি গর্বভরে বলেছিলেন," আমার ছেলে চব্বিশ বছর বয়সে সন্ন্যাসী হয়েছিল।" দেশ ও সমাজের জন্য এক মায়ের ত্যাগের একটি জাজ্বল্যমান উদাহরণ। এমন মায়ের ছেলে মাতৃভক্ত তো হবেই!
স্বামীজির স্বদেশভক্তির কথা তাঁর প্রতিটি বাণী ও কর্মে চিরভাস্বর হয়ে আছে। স্বদেশ তাঁর কাছে শুধু মাটি - পাথর, পাহাড় - পর্বত , নদ-নদী নয়— স্বদেশ তাঁর কাছে মাতৃস্বরূপা। ভারতবাসী তাঁর ভাই, ভারতবাসী তাঁর প্রাণ, ভারতের দেব-দেবী তাঁর ঈশ্বর, ভারতের সমাজ তাঁর শিশুশয্যা, তাঁর যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারাণসী। ভারতের মৃত্তিকা তাঁর স্বর্গ। ভারতবর্ষের দুর্দশার কারণ হিসাবে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন জনসাধারণের দারিদ্র ও আত্মবিস্মৃতিকে। তিনি বলতেন "খালি পেটে ধর্ম হয় না" । প্রথমেই তিনি জনগণের দারিদ্র দূরীকরণের উপায় খুঁজেছিলেন। স্বদেশের আপামর জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশা দেখে তাঁর প্রাণ কাঁদতো। চিকাগো থেকে তিনি হরিপদ মিত্রকে লিখেছেন - "আমি এদেশে এসেছি দেশ দেখতে নয়, তামাসা দেখতে নয়, নাম করতেও নয়, এই দারিদ্রের জন্য উপায় দেখতে।"২. অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তিনি স্বাভিমানপূর্ণ স্বাবলম্বনের পথও বাৎলে দিয়েছিলেন, যা আজও অনুসৃত হচ্ছে।
মাতৃভূমির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা-ভক্তি, আনুগত্য ও সমর্পণ ভাব ছিল অশ্রুতপূর্ব ও অতুলনীয়। তিনি বলতেন, "যদি এই পৃথিবীর মধ্যে এমন কোনও দেশ থাকে যাহাকে পুণ্যভূমি নামে বিশেষিত করা যাইতে পারে....... তাহা আমাদের মাতৃভূমি —এই ভারতবর্ষ।"৩. তিনি কম্বুকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, "মাতৃভূমির প্রতিই আমার সারা জীবনের আনুগত্য ; এবং আমাকে যদি সহস্রবার জন্মগ্রহণ করিতে হয়, তবে সেই সহস্র জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমার স্বদেশবাসীর, হে আমার বন্ধুবৰ্গ, তোমাদেরই সেবায় ব্যয়িত হইবে।"৪.
কলকাতার অভিনন্দনের উত্তরে প্রদত্ত ভাষণে স্বামীজি একটি ঘটনা শুনিয়েছিলেন। পাশ্চাত্যদেশ ছাড়ার আগে এক ইংরেজ বন্ধু তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন প্রায় চার বছর ভোগ-বিলাসের লীলাভূমিতে কাটিয়ে মাতৃভূমি কেমন লাগবে? স্বামীজি সগর্বে গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন, "পাশ্চাত্যভূমিতে আসিবার পূর্বে ভারতকে আমি ভালোবাসিতাম, এখন ভারতের ধূলিকণা পর্যন্ত আমার নিকট পবিত্র, ভারতের বায়ু আমার নিকট এখন পবিত্রতা মাখা, ভারত আমার নিকট এখন তীর্থস্বরূপ"।৫.
তাঁর সিংহনাদ "ওঠ জাগো লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থামবে না" জাতির, বিশেষ করে যুবসমাজের ঘুম ভাঙিয়েছিল, দেশে শুরু হয়েছিল নবজাগরণ। সেই ধারা ক্রমবর্ধমান রূপে আজও প্রবাহমান। স্বামীজির নিজের কথায় এই প্রবাহ আরও দেড় হাজার বছর চলবে। আজকের আত্মনির্ভর ভারত, 'ভকেল ফর লোকেল', স্বনির্ভরতা, নব্য শিক্ষানীতি এ সবই তো স্বামীজিরই চিন্তাধারা প্রসূত।
তথ্যসূত্র —
১.Vivekananda, A Biography, Swami Nikhilananda. Page —189
২.স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা — ৩,৫,৬
৩. - ঐ - ৫ম খণ্ড, পৃ—১
৪. - ঐ- পৃ—২৯১
৫. - ঐ - পৃ—১৫৮
----------------------------------------
সুশান্ত সরকার
গুয়াহাটি
লেখক পরিচিতি -- শ্রী সুশান্ত সরকার বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে সুদীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর বিভিন্ন ব্যাঙ্কে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব নির্বাহ করে ২০১৭ সনে অবসর গ্রহণের পর লেখালেখিকেই সাথী করেছেন । ইতিমধ্যে কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ।

0 Comments